আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঘোষিত ইশতেহারসমূহ: বাহ্যিক সংস্কারের প্রস্তাব, মূল কাঠামোগত সমস্যায় নীরবতা

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

بسم الله الرحمن الرحيم

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঘোষিত ইশতেহারসমূহ:

বাহ্যিক সংস্কারের প্রস্তাব, মূল কাঠামোগত সমস্যায় নীরবতা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি তাদের বিস্তারিত নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। তাদের মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও উভয় দলই একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র কাঠামোর রূপরেখা প্রস্তাব করেছে, যা মূলত পশ্চিমা পুঁজিবাদের আদলে তৈরি। বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহার “সবার আগে বাংলাদেশ”  মূলত একটি সংস্কারমূলক রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে প্রণীত হয়েছে, যেখানে অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণের কথা বলা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। আর, জামায়াতে ইসলামী’র নির্বাচনী ইশতেহার “নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ” মূলত একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা- যা মূলত ন্যায়বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষার মত প্রচলিত সংস্কারমূলক ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আমরা, হিযবুত তাহ্‌রীর, উলাই‘য়াহ্‌ বাংলাদেশ, দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছি, এসব নির্বাচনী ইশতেহার মূলত লোক দেখানো প্রতিশ্রুতি ও ফাঁপা বাগাড়ম্বরের বেশি কিছু নয়- যেগুলো প্রকৃত স্বাধীনতা কিংবা  আত্মনির্ভরশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। এসব ইশতেহার নব্য-ঔপনিবেশিক শোষণের মূল কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতেই ব্যর্থ; যেমন- আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের চাপিয়ে দেয়া কৃষিখাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার, বেসরকারিকরণ, এবং স্থানীয় শিল্প ধ্বংসকারী নীতিমালার বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট অবস্থান নেই। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) ও উন্মুক্ত বাজারের প্রশংসা করতে গিয়ে তারা এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেছে যে, এসব নীতির মাধ্যমেই জাতীয় সম্পদ কর্পোরেট শক্তির হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে- জ্বালানি খাত শেভরন ও এক্সনমোবিলের মতো বহুজাতিক কোম্পানির দখলে যাচ্ছে, আর কৌশলগত বন্দরসমূহ বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে সোপর্দ করা হচ্ছে। এর অনিবার্য পরিণতি হলো- বাংলাদেশকে স্থায়ীভাবে অর্থনৈতিক পরাধীনতা ও বিদেশি আধিপত্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখা। সর্বোপরি, এই শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার এবং জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারী ‘ট্রিকল-ডাউন’ মডেল প্রত্যাখ্যান করার কোন প্রতিশ্রুতি না থাকায় এসব ইশতেহার কাঠামোগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রকৃত বিকল্প প্রদান করবে না- কারণ এগুলোই জনগণকে নিঃস্ব করতে  এবং প্রকৃত মুক্তির পথকে অবরুদ্ধ রাখতে মূলত দায়ী।

প্রকৃতপক্ষে, এই ইশতেহারগুলো ভোটারদের প্রলুব্ধ করার জন্য একধরণের কৌশল, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত কাঠামোগত সংকটকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে: আর এই কাঠামোগত সংকটটি হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, যা শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করে। জনগণকে অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে যে, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বা শাসকের পরিবর্তন হলেও নিপীড়নমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকে রয়েছে- যা মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি এবং সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সাধারণ মানুষকে অবিরাম শোষন-নিপীড়ন করছে। অতএব, কোনো প্রতিশ্রুতি যা এই মূল কাঠামোকে উচ্ছেদ করতে ব্যর্থ, তা কেবল বাহ্যিক পরিবর্তনের সমতুল্য, এবং প্রকৃত মুক্তি আনতে সক্ষম নয়।

হে দেশবাসী, বাহ্যিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই ধারাবাহিক চক্র প্রমাণ করে যে, আল্লাহ্‌’র সার্বভৌমত্বের জায়গায় ত্রুটিপূর্ণ মানব সার্বভৌমত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত কোনো ব্যবস্থা স্বভাবতই ত্রুটিপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রকৃত ন্যায়বিচার কখনোই সেই ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী মডেল দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, যা শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি অভিজাতদের স্বার্থ রক্ষা করে। একমাত্র কার্যকর সমাধান হলো আল্লাহ্‌ ﷻ-এর সার্বভৌমত্বের উপর ভিত্তি করে শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ্‌ ﷻ হচ্ছেন একমাত্র আইনপ্রণেতা। এই ব্যবস্থায় যোগ্য খলিফাগণ (রাষ্ট্রপ্রধান) শাসন করবেন আল্লাহ্‌ প্রদত্ত আইন অনুযায়ী, যা স্বাভাবিকভাবেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এবং মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা সমগ্র দেশবাসীর প্রতি এটা উপলব্ধি করার আহ্বান জানাচ্ছি যে, শোষণ ও দাসত্ব থেকে মুক্তির প্রকৃত পথ একমাত্র আল্লাহ্ প্রদত্ত শাসন কাঠামোর মধ্যে নিহিত। আমরা আপনাদেরকে নবুয়তের আদলে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি- কারণ খিলাফতই একমাত্র ব্যবস্থা যা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে, স্বনির্ভর শিল্পায়ন গড়ে তুলতে পারে, এবং আল্লাহ্‌ ﷻ-এর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উম্মাহ্’র মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারে। আল্লাহ্ ﷻ পবিত্র কুর‘আন-এ বলেন:

﴿وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُم فِي الأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ

 “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি  অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে খিলাফত (শাসনকর্তৃত্ব)  দান করবেন, যেমন তিনি তাদের পূর্ববর্তীদেরকে দান করেছিলেন…” [সূরা নূর: ৫৫]

হিযবুত তাহ্রীর, উলাই‘য়াহ্‌ বাংলাদেশএর মিডিয়া অফিস